কাতারে জীবন যেমনঃ সড়ক পারাপারে সতর্ক হতে হবে

আবদুল্লাহ আল মামুন:: দোহা শহরের রাস্তায় গাড়ী দুর্ঘটনার খবর প্রতিদিনই পত্র-পত্রিকায় দেখতে পাই। সেদিন একজন প্রবাসী বাংলাদেশি যুবকের মুত্যু হলো এই শহরেরই রাস্তায়। কয়েক দিন পরই অবিবাহিত ওই যুবকটির দেশে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হয়ে হয়ে উঠেনি। একটি সম্ভাবনাময় যুবকের এমন অকাল মুত্যু কমিউনিটিতে শোকের ছায়া ফেলেছে।
কাতারের গুরুত্বপূর্ন সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা, রাডার বসিয়ে বেপরোয়া চালকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে সরকার। কাতারের ট্রাফিক বিভাগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান মতে, গাড়ীর সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। তবে গাড়ী বাড়লেও গাড়ী দুর্ঘটনার হার কমেছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে গাড়ী দুর্ঘটনার হার ২.৪ শতাংশ কমেছে। আর দুর্ঘটনাজনিত জখমের পরিমান ১.৩ শতাংশ কমেছে। এটা সুখব রই বটে! তবে ২০১৭ সালে কাতারের রাস্তায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৭৭ জনের। যার মধ্যে ৩২ শতাংশই হলেন পথচারী। নিহতের এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, কাতারের সড়ক পথচারীদের জন্য এখনো খুব একটা নিরাপদ নয়। যা খুবই উদ্বেগজনক।
রাস্তা কেবল গাড়ী চলাচল করার জন্য নয়। গাড়ীর সাথে সাথে পথচারীদেরও নিরাপদে রাস্তা ব্যবহার করার অধিকার রয়েছে। দোহা শহরে অনেকটা নিজের জীবন হাতে নিয়ে পথচারীদের সড়ক পারাপার করতে হয়। বহু জায়গায় গাড়ী দখল করে নিয়েছে পথচারীদের জন্য নির্মিত ফুটপাত। ফলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলার সময় পথচারীদের বার বার ফুটপাত ছেড়ে পিচঢালা রাজপথে নামতে হয়। যা পথচারীদের জন্য খুবই বিপদজনক।

পথচারী পারাপারের জন্য ব্যস্ত রাস্তায় আড়াআড়ি সাদা-কালো দাগ চিহিৃত নির্দিষ্ট অংশ জেব্রা ক্রসিং নামে পরিচিত। আধুনিক শহরগুলোতে পথচারীরা এই জেব্রা ক্রসিং দিয়েই রাস্তা পার হয়ে থাকেন। উন্নত দেশে কোনো পথচারী রাস্তার জেব্রা ক্রসিং-এ পা রাখলে সব গাড়ী সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যায়। পথচারী পার হলে তবেই পাড়ী চলাচল শুরু হয়। কিন্তু এখানে গাড়ী চলাচলের মধ্যে রাস্তা পারাপারের সময় গাড়ী কমে কখন নিরাপদ ফাঁকা হবে সে জন্য উল্টো পথচারীদেরই দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মনে হচ্ছে পথচারীরা রাস্তা পারাপারের এটাই নিয়ম বলে মেনে নিয়েছেন। পথচারীদের অধিকার এবং নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ সচেতন নয় বলেই দোহা শহরের রাস্তায় পথচারীরা প্রান হারাচ্ছে। কাতারে আগমনের কিছুদিন পর রাস্তা পার হতে গিয়ে একবার আমি গাড়ী চাপা পড়তে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসি।
ফুটবল বিশ^কাপ ২০২২ আর খুব বেশী দূরে নয়। বিশ^কাপের সময় কাতারে নামবে পর্যটকের ঢল। উপরন্তু শীতকালে এই আয়োজন বসছে বলে সুন্দর আবহাওয়ায় বহু মানুষ রাস্তায় চলাচল করবে। রাস্তায় পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ট্রাফিক বিভাগের প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে। না হলে আসন্ন বিশ^কাপের সময় বিদেশ থেকে আগত লক্ষ পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে।
ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যানে রাস্তায় দুর্ঘটনার মূল কারন হিসাবে শীর্ষে রয়েছে উচ্চ গতিতে গাড়ী চালানো, সিট বেল্ট না বাধা, এবং মুঠো ফোনের ব্যবহার। তবে উচ্চ গতিতে এবং নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ী চালানোর ব্যাপারে গাড়ীচালকদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন এখনো আমার চোখে পড়ছেনা। ক্যামেরায় ধরা পড়ার ভয়ে কিছুক্ষণের জন্য গাড়ীর গতি কমিয়ে আনলেও, ক্যামেরার নির্ধারিত বলয় পার হয়ে গেলে গাড়ী চালকরা আবারো আগের গতিতে ফিরে যাচ্ছেন।
বিপর্যয়ের সময় মুঠোফোন যেমন রক্ষা করতে পারে জীবন তেমনি গাড়ী চালানোর সময় মুঠোফোনের ব্যবহার কেড়ে নিতে পারে জীবন। সম্প্রতি কাতারের রাস্তায় ৫২% শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে গাড়ী চলাকালীন মুঠো ফোনের ব্যবহারকে। গাড়ী চালানোর সময় যদি আপনি দেখতে পান সামনের গাড়ীটি হঠাৎ করে ধীর গতিতে চলতে শুরু করেছে, সোজা না গিয়ে এঁকে বেঁকে চলছে কিংবা পাশের লেইনের গাড়ীটি আপনার গাড়ীর গা ঘেঁষে চলতে চাচ্ছে তখনই বুঝতে হবে, গাড়ী চালক নির্ঘাত মুঠোফোনে ব্যস্ত। গাড়ীতে মুঠো ফোন ব্যবহার এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।

রাস্তায় অনেক সময় জরুরী কাজে ফোনের ব্যবহার অপরিপার্য্ হয়ে পড়ে। সেজন্য বাজারে যে সব ফোন হোল্ডার পাওয়া যায় সেগুলোর কোনো একটি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিংবা একটু বাড়তি খরচ করে গাড়ীর রেডিওতে ব্লু-টুথ সংযোগ লাগিয়ে নিয়ে ফোন ব্যবহার করা অনেক নিরাপদ। এছাড়া এখন গুগল অ্যাপস ব্যবহার করে ফোনে হাত না লাগিয়ে মুখে নির্দেশ দিয়ে ফোন ধরা ও করা যেতে পারে। এমনকি এভাবে টেক্সট ম্যাসেজও পাঠানো যেতে পারে।
কাতারের ট্রাফিক বিভাগের নেয়া বেশ কিছু পদক্ষেপ এখন সুফল বয়ে আনতে শুরু করেছে। যেমন মুঠোফোনজনিত আইন লঙ্ঘনকারীর সংখ্যা ২০১৫ সালের তুলনায় এখন প্রায় ৬০ শতাংশ কমে এসেছে। এখন রাস্তায় স্পিড রাডারের সংখ্যা আগের চেয়ে বহুগুনে বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া কাতারী এবং প্রবাসী নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও চলছে। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে কাতারের রাস্তা খুব সহসা সবার জন্য নিরাপদ হবে বলে আশা করছি।